আরিফ হোসেনVIEW PROFILE →
নগদ থেকে কিউআর: বাংলাদেশের মোবাইল আর্থিক সেবা কীভাবে নতুন যুগে প্রবেশ করছে
বিকাশ, নগদ ও রকেটের হাত ধরে বাংলাদেশ নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে ডিজিটাল লেনদেনে রূপান্তরিত হচ্ছে। ১১ কোটির বেশি অ্যাকাউন্ট, আন্তঃলেনদেন ব্যবস্থা এবং পেমেন্ট ছাড়িয়ে সমন্বিত আর্থিক সেবার নতুন অধ্যায়।
এক দশক আগেও বাংলাদেশে টাকা পাঠানো মানে ছিল ব্যাংকের লম্বা লাইন কিংবা বিশ্বস্ত কারও হাতে খাম তুলে দেওয়া। কিন্তু বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা বা এমএফএস সেই চিত্র আমূল বদলে দিয়েছে। আজ দেশে নিবন্ধিত এমএফএস অ্যাকাউন্টের সংখ্যা এগারো কোটি ছাড়িয়েছে এবং বিশ্বের মোট মোবাইল মানি অ্যাকাউন্টের প্রায় বারো শতাংশই বাংলাদেশের দখলে, যা এই খাতে দেশের অসাধারণ অগ্রগতির প্রমাণ।
বিপ্লবের নাম এমএফএস
এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে বিকাশ, যা কয়েক কোটি গ্রাহককে সেবা দিয়ে গোটা বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ বিনিয়োগ দফায় দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যায়ন পেয়ে বিকাশ পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র প্রযুক্তি ইউনিকর্নে। নগদ ও রকেটসহ অন্যান্য সেবাদাতা প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করেছে, আর এর সুফল পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ, যাঁরা এখন হাতের মুঠোয় থাকা ফোন দিয়েই মুহূর্তে টাকা পাঠাতে ও গ্রহণ করতে পারছেন।
আন্তঃলেনদেন: এক প্ল্যাটফর্মে সব
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে সাম্প্রতিক সময়ে। ২০২৫ সালের পহেলা নভেম্বর থেকে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ বা এনপিএসবি ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা এবং পেমেন্ট সেবাদাতাদের একটি অভিন্ন আন্তঃলেনদেনযোগ্য প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করেছে। এর ফলে এখন যেকোনো ব্যাংক বা ওয়ালেট থেকে অন্য যেকোনোটিতে সরাসরি, রিয়েল টাইমে এবং নির্ধারিত ও প্রকাশিত মাশুলে টাকা স্থানান্তর করা যায়, যা ব্যবহারকারীর জন্য এক বিশাল স্বস্তির খবর।
পেমেন্ট ছাড়িয়ে
তবে ২০২৬ সালে এসে এই খাত কেবল টাকা পাঠানোর মধ্যে আটকে নেই। ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন মার্চেন্ট পেমেন্ট ও কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন, ডিজিটাল ঋণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের অর্থায়ন, এপিআইনির্ভর আর্থিক সেবা এবং সীমান্ত পেরিয়ে রেমিট্যান্সের মতো ক্ষেত্রে বিস্তৃত হচ্ছে। অর্থাৎ, দেশ ধীরে ধীরে কেবল পেমেন্টকেন্দ্রিক মডেল থেকে সরে গিয়ে একটি সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সেবার বাস্তুতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির শক্তি
এই ডিজিটাল রূপান্তরের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। যাঁরা কখনো ব্যাংকের দরজা মাড়াননি, সেই প্রান্তিক মানুষ, গ্রামের নারী ও ছোট ব্যবসায়ীরা এখন আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠছেন। প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স দ্রুত ও নিরাপদে পরিবারের কাছে পৌঁছাচ্ছে, আর দৈনন্দিন কেনাকাটা থেকে বিল পরিশোধ, সবকিছুই এখন একটি মোবাইল ফোনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে এসেছে।
চ্যালেঞ্জ ও সামনের পথ
তবে সাফল্যের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়। লেনদেনের মাশুল, ডিজিটাল সাক্ষরতার ঘাটতি, প্রতারণা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং একটি মাত্র মাধ্যমের ওপর অতিনির্ভরতা এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়। তবুও আন্তঃলেনদেন ব্যবস্থা এবং সমন্বিত সেবার এই নতুন ঢেউ ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ মোবাইল মানির বৈশ্বিক মানচিত্রে নেতৃত্বদানকারী দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান আরও পাকাপোক্ত করতে পারবে।






