আরিফ হোসেনVIEW PROFILE →
এআইয়ের জ্বালানি জিপিইউ: নিজস্ব কম্পিউটিং শক্তি গড়ার চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ
জাতীয় এআই নীতি ২০২৬-৩০ জিপিইউ সংগ্রহ ও জাতীয় এআই কম্পিউট কৌশলের অঙ্গীকার করেছে, কিন্তু জিপিইউ সংকট আর দক্ষতার ঘাটতি এখনও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আসল ভিত্তি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনায় সাধারণত অ্যাপ, চ্যাটবট আর নানা রকম সফটওয়্যারের কথাই সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। কিন্তু এই পুরো প্রযুক্তির নিচে লুকিয়ে থাকা আসল ভিত্তি হলো বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং শক্তি, যা ছাড়া কোনো এআই মডেল প্রশিক্ষণ বা পরিচালনা করাই সম্ভব নয়।
এই কম্পিউটিং শক্তির কেন্দ্রে রয়েছে বিশেষ ধরনের প্রসেসর, যার নাম জিপিইউ বা গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট। বড় বড় ভাষা মডেল থেকে শুরু করে ছবি বিশ্লেষণ, সবকিছুর জন্যই দরকার হাজার হাজার এমন চিপ, আর ঠিক এখানেই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় বাস্তব চ্যালেঞ্জটি এসে দাঁড়িয়েছে।
সরকার ডিজিটাল অর্থনীতির অবদান আগামী পাঁচ বছরে জিডিপির বর্তমান এক থেকে দুই শতাংশ থেকে দশ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য পূরণের জন্য শুধু নীতি আর বিনিয়োগ নয়, প্রয়োজন শক্তিশালী প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, যার মেরুদণ্ড হলো নিজস্ব কম্পিউটিং সক্ষমতা।
জাতীয় এআই কম্পিউট কৌশল

বাংলাদেশের খসড়া জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি ২০২৬-২০৩০ এই বাস্তবতা স্পষ্টভাবে স্বীকার করে নিয়েছে। নীতিতে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার যৌথ ব্যবহারের জন্য জিপিইউ সংগ্রহের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করা হয়েছে, যাতে দেশের ভেতরেই এআই গবেষণা ও উন্নয়নের একটি ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
এর পাশাপাশি একটি জাতীয় এআই কম্পিউট কৌশল তৈরির কথাও নীতিতে বলা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো, ব্যয়বহুল কম্পিউটিং সম্পদ যেন কেবল বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দি না থাকে, বরং স্টার্টআপ, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকরাও যেন সাশ্রয়ী মূল্যে তা ব্যবহার করতে পারেন।
এই ভাবনা নতুন নয়, বরং অতীতের ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ২০২৪ সালে ওরাকল সভরিন ক্লাউড চালু করেছে, যা দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিজস্ব সীমানার ভেতরে রাখার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের আলোচনায়।
জিপিইউ সংকট ও অবকাঠামোর বাস্তবতা
তবে কাগজে-কলমে থাকা এই পরিকল্পনা আর মাঠের বাস্তবতার মধ্যে বড় একটি ফারাক রয়েছে। বিশ্বজুড়ে চাহিদা তুঙ্গে থাকায় উন্নত জিপিইউর সরবরাহে তীব্র সংকট চলছে, আর দাম এতটাই বেশি যে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক চিপ সংগ্রহ করা রীতিমতো কঠিন।
এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দেশের উদ্ভাবনী স্টার্টআপগুলো থেমে নেই। বর্তমানে দেশে বারোশোরও বেশি সক্রিয় স্টার্টআপ রয়েছে এবং এ খাতে প্রায় একশ কোটি ডলারের বিনিয়োগ এসেছে, যা স্থানীয় সমস্যা সমাধানে প্রযুক্তির প্রয়োগ নিয়ে তরুণদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহেরই প্রতিফলন।
এর একটি ভালো উদাহরণ হলো ইন্টেলিজেন্ট মেশিনস নামের প্রতিষ্ঠান, যারা কৃষকদের সঙ্গে কাজ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সমাধান তৈরি করছে। এমন উদ্যোগই দেখিয়ে দেয়, সীমিত অবকাঠামোর মধ্যেও স্থানীয় প্রয়োজন মেটাতে এআই কীভাবে বাস্তব মূল্য যোগ করতে পারে।
দক্ষতা ও নৈতিকতার ঘাটতি
অবকাঠামোর পাশাপাশি আরেকটি গভীর সমস্যা হলো দক্ষ জনবল ও নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি। বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক দিক নিয়ে পাঠদান এখনো প্রায় অনুপস্থিত, যা ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের পথে বড় বাধা হতে পারে।
তবে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা এই খাতকে ঘিরে যথেষ্ট উজ্জ্বল। সরকার প্রতি বছর প্রযুক্তি খাতে দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, আর দেশে ইতিমধ্যে ছয় লাখ পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন, যা এক বিশাল ডিজিটাল কর্মশক্তির ভিত্তি।
সামনের পথ
বাংলাদেশ স্টার্টআপ কানেক্টের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করার চেষ্টাও চলছে, যা দেশের প্রযুক্তি খাতে আন্তর্জাতিক আস্থা ও অর্থায়ন বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে আগামী কয়েক বছরে।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের এআই যাত্রার সাফল্য নির্ভর করবে অবকাঠামো, দক্ষতা আর নীতির সঠিক সমন্বয়ের ওপর। জিপিইউর মতো ভিত্তিমূলক সম্পদ নিশ্চিত করা গেলে, তরুণ জনগোষ্ঠীর সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে দেশটি সত্যিকার অর্থেই একটি আঞ্চলিক ডিজিটাল শক্তিতে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।






