আরিফ হোসেনVIEW PROFILE →
পশ্চিম ছেড়ে উপসাগরের পথে: কীভাবে উপসাগরীয় বিনিয়োগ বদলে দিচ্ছে বাংলাদেশের স্টার্টআপ মানচিত্র
ঐতিহ্যবাহী পশ্চিমা ভেঞ্চার ক্যাপিটালের বদলে এখন উপসাগরীয় অঞ্চলের বিনিয়োগকারীদের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো। পাঠাওয়ের নতুন বিনিয়োগ থেকে শুরু করে শপআপ ও সৌদি সারি-র বিশাল একীভূতকরণ,দক্ষিণ এশিয়া ও উপসাগরের মধ্যে গড়ে উঠছে এক নতুন করিডোর।
বাংলাদেশের প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ খাত গত এক দশকে যে গতিতে এগিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয় এবং আশাব্যঞ্জক একটি চিত্র তুলে ধরে সবার সামনে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই খাতে একটি নতুন এবং তাৎপর্যপূর্ণ প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে দেশের উদ্যোক্তারা তহবিল সংগ্রহের জন্য ঐতিহ্যবাহী পশ্চিমা উৎসের পরিবর্তে ক্রমশ উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে দৃষ্টি ফেরাচ্ছেন।
পাঠাওয়ের নতুন বিনিয়োগ
এই নতুন প্রবণতার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণগুলোর একটি হলো দেশের শীর্ষস্থানীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পাঠাও, যা রাইড শেয়ারিং থেকে শুরু করে খাবার সরবরাহ ও আর্থিক সেবা পর্যন্ত বিস্তৃত। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি একটি প্রি-সিরিজ বি রাউন্ডে মোট এক কোটি বিশ লাখ ডলারের বিনিয়োগ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে, যা তাদের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের পথ আরও সুগম করবে।
এই বিনিয়োগ রাউন্ডটির নেতৃত্ব দিয়েছে ভেঞ্চারসুক নামের একটি প্রতিষ্ঠান, যা মূলত উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসি অঞ্চল ভিত্তিক একটি তহবিল। একটি উপসাগরীয় তহবিলের এই নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টিই মূলত বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে অর্থায়নের উৎস পরিবর্তনের এই নতুন দিকটিকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে এবং ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়।

শপআপ ও সারি-র মিলন
উপসাগরীয় সংযোগের আরও একটি বড় এবং শক্তিশালী উদাহরণ হলো বাংলাদেশের বিটুবি বাণিজ্য প্ল্যাটফর্ম শপআপের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ, যা ছোট ব্যবসাগুলোকে পণ্য সরবরাহ ও ঋণ সুবিধা দিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি সৌদি আরবের সারি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হয়ে সিল্ক নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন সত্তা গঠন করেছে, যা এই খাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
এই একীভূতকরণ চুক্তিটির আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে দশ কোটি ডলারেরও বেশি, যা এটিকে এই অঞ্চলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ চুক্তিতে পরিণত করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল উৎপাদন ও সরবরাহ ক্ষমতার সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিপুল চাহিদাকে যুক্ত করে একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক করিডোর তৈরি হচ্ছে।
সমৃদ্ধ এক বাস্তুতন্ত্র
এই দুটি বড় ঘটনা আসলে বাংলাদেশের সামগ্রিক স্টার্টআপ বাস্তুতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান শক্তি ও পরিপক্বতারই প্রতিফলন মাত্র, বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বর্তমানে দেশে দুই হাজার পাঁচশোরও বেশি সক্রিয় স্টার্টআপ রয়েছে, যেগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় পনেরো লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে এবং দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে।
তহবিল সংগ্রহের দিক থেকেও এই খাতের অগ্রগতি রীতিমতো চোখে পড়ার মতো এবং এটি বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, দুই হাজার দশ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো সব মিলিয়ে নব্বই কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে, যা এই খাতের সম্ভাবনাকেই নির্দেশ করে।
শক্তিশালী খাতগুলো
বাংলাদেশের এই স্টার্টআপ বিপ্লবের পেছনে বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট খাত মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে, যেগুলো দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী খাতগুলো হলো আর্থিক প্রযুক্তি বা ফিনটেক, ই-কমার্স, পরিবহন বা মোবিলিটি, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বা লজিস্টিকস, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি বা হেলথটেক এবং কৃষি প্রযুক্তি বা এগ্রিটেক।
এই বৈচিত্র্যময় খাতগুলোর উপস্থিতি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি এখন আর কোনো একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বহুমুখী হয়ে উঠছে। স্থানীয় পুঁজি ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে এবং সরকার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সহায়তা কাঠামো উদ্যোক্তাদের আচরণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
নতুন এক দিগন্ত
উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে এই ঝোঁক আসলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন মানচিত্র উন্মোচন করছে, যেখানে সম্ভাবনার দুয়ার আরও প্রশস্ত হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী পশ্চিমা ভেঞ্চার ক্যাপিটালের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উপসাগরীয় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা কৌশলগতভাবে দেশের প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত এখন এক রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ভৌগোলিক সীমানা আর কোনো বাধা নয়। পাঠাও ও শপআপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর এই সাফল্য শুধু নিজেদের গল্প নয়, বরং তা সমগ্র দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অনুপ্রেরণা এবং বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশের সক্ষমতার এক জ্বলন্ত প্রমাণ হয়ে উঠছে।






