আরিফ হোসেনVIEW PROFILE →
ডিজিটাল বাজারের উত্থান: বাংলাদেশে ই-কমার্স ছুঁতে পারে ১০ বিলিয়ন ডলার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালে বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজার ১০.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। মোবাইল পেমেন্ট, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ও উন্নত লজিস্টিক এই প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি।
স্টার্টআপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মতো আলোচিত বিষয়ের বাইরেও বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতে একটি নীরব বিপ্লব ঘটে চলেছে, আর তা হলো ই-কমার্স বা অনলাইন বাণিজ্যের বিস্ময়কর উত্থান। এক সময়ের ছোট এই খাত এখন দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।
একসময় যেখানে দোকানে গিয়ে কেনাকাটাই ছিল একমাত্র উপায়, সেখানে আজ কোটি মানুষ হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন থেকেই তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য কিনছেন। এই অভ্যাসের পরিবর্তন কেবল জীবনযাত্রাকেই সহজ করেনি, বরং একটি বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ারও খুলে দিয়েছে দেশের সামনে।
১০ বিলিয়ন ডলারের বাজার
বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজারের আকার নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার পূর্বাভাসে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও প্রবৃদ্ধির ধারা নিয়ে সবাই একমত। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এই বাজারের আকার ১০.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা এক বিশাল অঙ্ক।
এই প্রবৃদ্ধির গতি বোঝা যায় অতীতের সঙ্গে তুলনা করলে। ২০২২ সালের শেষে যেখানে এই বাজারের আকার ছিল প্রায় ৬.৬ বিলিয়ন ডলার, সেখান থেকে মাত্র কয়েক বছরে এই লাফ সত্যিই চোখ ধাঁধানো এবং খাতটির অন্তর্নিহিত শক্তির প্রমাণ বহন করে।
অবশ্য কিছু গবেষণায় ২০২৬ সালের বাজারের আকার ৫ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে থাকার কথাও বলা হয়েছে। পরিসংখ্যানে পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় নিশ্চিত, তা হলো খাতটি ধারাবাহিকভাবে দুই অঙ্কের ঘরে বা তার কাছাকাছি হারে বছরের পর বছর সম্প্রসারিত হচ্ছে।
প্রবৃদ্ধির পেছনের চালিকাশক্তি

এই বিস্ময়কর সম্প্রসারণের পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশের বিপুল সংখ্যক ইন্টারনেট ব্যবহারকারী, যাদের সংখ্যা এখন ১৩ কোটিরও বেশি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীই অনলাইন বাজারের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহার এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসারও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। বিকাশ ও নগদের মতো মোবাইল আর্থিক সেবাগুলো লেনদেনকে সহজ করে দিয়েছে, ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও এখন নির্দ্বিধায় অনলাইনে কেনাকাটা করতে পারছেন।
পাশাপাশি, উন্নত হতে থাকা লজিস্টিক বা পণ্য সরবরাহের অবকাঠামো এই খাতের ভিত্তিকে আরও মজবুত করেছে। পণ্য অর্ডার করার পর তা দ্রুত ও নিরাপদে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনলাইন কেনাকাটার প্রতি মানুষের আস্থা দিন দিন বাড়ছে।
বাজারের প্রধান খেলোয়াড়রা
বাংলাদেশের ই-কমার্স জগতে ২০২৬ সালে সবচেয়ে বড় সাধারণ মার্কেটপ্লেস হিসেবে আধিপত্য বজায় রেখেছে দারাজ। মোট বিক্রির পরিমাণ, বিক্রেতার সংখ্যা এবং পণ্যের বৈচিত্র্যের দিক থেকে প্রতিষ্ঠানটি শীর্ষে রয়েছে, যার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এক লাখেরও বেশি বিক্রেতা।
দারাজের পাশাপাশি নির্দিষ্ট খাতে বিশেষায়িত আরও কিছু প্রতিষ্ঠানও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য চালডাল কিংবা ইলেকট্রনিক্সের জন্য পিকাবুর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো নিজ নিজ ক্ষেত্রে গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করে বাজারকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বাণিজ্য বা সোশ্যাল কমার্সের উত্থানও লক্ষণীয়। ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অসংখ্য ছোট উদ্যোগ প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করছে এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগের সৃষ্টি করছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ই-কমার্স খাত এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সঠিক নীতিসহায়তা, ভোক্তা অধিকার সুরক্ষা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে এই ডিজিটাল বাজার দেশের অর্থনীতিতে আগামী দিনে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।






