আরিফ হোসেনVIEW PROFILE →
ডিজিটাল অর্থনীতিতে বড় লক্ষ্য বাংলাদেশের, নতুন বাজেটে স্টার্টআপ তহবিল ও প্রযুক্তি খাতে বিপুল বিনিয়োগ
2026-27 অর্থবছরের বাজেটে বাংলাদেশ সরকার প্রযুক্তি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। 500 কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল, বছরে দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান এবং ডিজিটাল অর্থনীতির অংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ 2026 সালে তথ্যপ্রযুক্তি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতির লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকার নতুন অর্থবছরের বাজেটে প্রযুক্তি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে এবং এই খাতকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে।
বাজেটে প্রযুক্তি খাতের বরাদ্দ
2026-27 অর্থবছরের বাজেটে প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের জন্য 2,049 কোটি টাকা এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের জন্য 2,141 কোটি টাকা রাখা হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় পেয়েছে সবচেয়ে বড় বরাদ্দ, 18,115 কোটি টাকা।
এই বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বরাদ্দের এই কাঠামো থেকে স্পষ্ট যে সরকার শুধু একটি নির্দিষ্ট খাতে নয়, বরং টেলিযোগাযোগ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, গবেষণা এবং সৃজনশীল শিল্পকে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে।
স্টার্টআপ তহবিল ও উদ্যোক্তা সহায়তা

এবারের বাজেটের অন্যতম নতুন উদ্যোগ হলো 500 কোটি টাকার একটি স্টার্টআপ তহবিল গঠন। এই তহবিলের মূল লক্ষ্য দেশের তরুণ উদ্যোক্তা এবং বিশেষভাবে নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা, যাতে তারা প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ব্যবসা গড়ে তুলতে পারেন। এছাড়া গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য আলাদা 100 কোটি টাকা রাখা হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের জন্য কর ছাড়ের ক্ষেত্রেও বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যেসব স্টার্টআপের বার্ষিক আয় 100 কোটি টাকা পর্যন্ত, সেগুলো এক দশক ধরে টার্নওভার কর, ভ্যাট, অগ্রিম কর, নিয়ন্ত্রক শুল্ক এবং শুল্ক থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি পাবে। এই সুবিধা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় স্বস্তি বয়ে আনবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট নির্মাতাদের সুবিধা
ডিজিটাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ফ্রিল্যান্সিং এবং কনটেন্ট তৈরির খাত। নতুন বাজেটে প্রায় 500,000 ফ্রিল্যান্সার এবং কনটেন্ট নির্মাতাকে 7.5 শতাংশ উৎসে কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত দেশের বিপুল সংখ্যক তরুণ পেশাজীবীর জন্য সরাসরি আর্থিক সুবিধা নিয়ে আসবে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসাদ এই উদ্যোগের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, তাদের লক্ষ্য খুবই সহজ। তিনি জানান, নাগরিকদের জন্য তারা এমন সংযোগ চান যা সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বমানের হবে। এর মাধ্যমে সংযোগকে বিলাসিতা নয়, বরং অর্থনৈতিক সহায়ক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
টেলিযোগাযোগ খাতে কর সংস্কার
টেলিযোগাযোগ খাতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর সংস্কার আনা হয়েছে। আগের 300 টাকার নির্দিষ্ট সিম কর তুলে দিয়ে সেখানে 15 শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি মোবাইল নেটওয়ার্কের উৎসে কর 12 শতাংশ থেকে কমিয়ে 10 শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা গ্রাহকদের জন্য কিছুটা সুবিধা তৈরি করবে।
প্রযুক্তি পণ্যের ক্ষেত্রেও কর কমানো হয়েছে। কম্পিউটার, প্রিন্টার, বহনযোগ্য ডিভাইস, ফ্ল্যাশ মেমরি এবং মনিটরের ওপর অগ্রিম আয়কর কমিয়ে 2 শতাংশে আনা হয়েছে। এছাড়া মোবাইল উৎপাদনকারীদের জন্য 22 ধরনের কাঁচামালের আমদানি কর সর্বোচ্চ 5 শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র 1 শতাংশে নামানো হয়েছে।
ডিজিটাল অর্থনীতির বড় লক্ষ্য
সরকার ডিজিটাল অর্থনীতিকে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে আরও বড় ভূমিকায় দেখতে চাইছে। বর্তমানে ডিজিটাল অর্থনীতির অবদান জিডিপির প্রায় 1 থেকে 2 শতাংশ, যা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে 10 শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি একটি উচ্চাভিলাষী কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বড় লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সরকার প্রযুক্তি খাতে প্রতি বছর দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা করেছে। এই লক্ষ্য পূরণ হলে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে এবং বেকারত্ব কমাতে সহায়তা করবে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সহায়তা
শুধু বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্যও সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এসএমই অর্থায়নের জন্য 2,000 কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক 60,000 কোটি টাকার একটি বৃহৎ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে 5,000 কোটি টাকা কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য নির্ধারিত।
এছাড়া সৃজনশীল শিল্পের জন্য প্রাথমিকভাবে 300 কোটি টাকা এবং নীল অর্থনীতির জন্য 100 কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এসব বরাদ্দ থেকে বোঝা যায় যে সরকার প্রযুক্তির পাশাপাশি অর্থনীতির বিভিন্ন উদীয়মান খাতকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করতে চাইছে।
সামনের পথ
সব মিলিয়ে 2026-27 অর্থবছরের বাজেট বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের প্রতি সরকারের দৃঢ় প্রতিশ্রুতিকে তুলে ধরেছে। স্টার্টআপ তহবিল, কর সংস্কার, ফ্রিল্যান্সারদের সুবিধা এবং বড় কর্মসংস্থানের লক্ষ্য একসঙ্গে দেশের প্রযুক্তি খাতে নতুন গতি আনতে পারে। আগামী কয়েক বছরে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ কতটা সফল হয়।





