আরিফ হোসেনVIEW PROFILE →
বাংলাদেশের জাতীয় এআই নীতি ২০২৬-২০৩০: ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা আর নতুন সংস্থা
বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য একটি জাতীয় নীতি তৈরি করছে। খসড়া নীতিতে ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, গণনজরদারির নিষেধাজ্ঞা এবং একটি নতুন সমন্বয়কারী সংস্থার কথা বলা হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশও পিছিয়ে থাকতে চায় না। দেশটি প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় নীতি তৈরি করছে, যা ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত এই খাতের দিকনির্দেশনা ঠিক করে দেবে।
ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এই খসড়া জাতীয় এআই নীতি ২০২৬-২০৩০ চূড়ান্ত করছে। নীতির কেন্দ্রে রয়েছে একটি ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, যেখানে এআই ব্যবস্থাগুলোকে চারটি ভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী প্রতিটি শ্রেণির জন্য আলাদা নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
এই ধরনের শ্রেণিবিন্যাসের উদ্দেশ্য হলো, প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি এর সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। কম ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারে তুলনামূলকভাবে শিথিল নিয়ম থাকলেও, বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা রাখা হবে বলে নীতিতে উল্লেখ রয়েছে।
কিছু ব্যবহারে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা

নীতিতে কয়েকটি নির্দিষ্ট ব্যবহারের ওপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জনপরিসরে সরাসরি বায়োমেট্রিক নজরদারি, নাগরিকদের সামাজিক স্কোরিং ব্যবস্থা এবং এআই দিয়ে পরিচালিত অস্ত্র। এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ব্যবস্থাগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক কিছু শর্ত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যালগরিদমের প্রভাব মূল্যায়ন, মানুষের তত্ত্বাবধান এবং স্বচ্ছতার দায়িত্ব। অর্থাৎ এসব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের পেছনে মানুষের নিয়ন্ত্রণ ও কৈফিয়ত থাকতে হবে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার
এই নীতি শুধু অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারও যুক্ত। বাংলাদেশ ইউরোপ কাউন্সিলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক কাঠামো কনভেনশন অনুসমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাস্তবায়িত হলে দেশটি হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশ।
পাশাপাশি নীতিটি ইউনেস্কোর এআই নৈতিকতাবিষয়ক সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা হচ্ছে। এটিকে ২০২৫ সালের খসড়া ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা অধ্যাদেশের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে, যাতে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং এআই নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে নিশ্চিত করা যায়।
নতুন প্রতিষ্ঠান ও তদারকি
নীতির বাস্তবায়ন তদারকির জন্য একটি নতুন কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে। জাতীয় তথ্য সুশাসন ও উদ্ভাবন সংস্থাকে সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, আর বিভিন্ন খাতের তদারকি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বিদ্যমান মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে।
এছাড়া একটি স্বাধীন তদারকি কমিটি গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে, যার জন্য সংসদীয় আইন প্রয়োজন হবে। নীতিতে বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০২৮ সালে একটি বাধ্যতামূলক মধ্যবর্তী পর্যালোচনা এবং ২০৩০ সালে নবায়নের শর্তসহ একটি সূর্যাস্ত ধারা রাখা হয়েছে, যা নীতিটিকে সময়োপযোগী রাখবে।
প্রস্তুতির ঘাটতি
তবে বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ইউনেস্কো, ইউএনডিপি ও আইসিটি বিভাগের যৌথ এআই প্রস্তুতি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে ১৫টি অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে।
চিহ্নিত সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে খণ্ডিত তথ্যব্যবস্থা, জিপিইউ বা উন্নত প্রসেসরের সংকট, সেকেলে শিক্ষাক্রম এবং এআই নৈতিকতা শিক্ষার প্রায় অনুপস্থিতি। এর পাশাপাশি এআই খাতে কর্মশক্তিতে নারী ও পুরুষের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্যের বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
ভাষা ও ভবিষ্যৎ
বাংলা ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা এখনও সীমিত। বর্তমানে কেবল হিসাব নামের একটি প্রতিষ্ঠান বাংলা ভাষার বৃহৎ ভাষা মডেল তৈরি করছে। অথচ বিশ্বজুড়ে ১৭ কোটিরও বেশি মানুষ বাংলায় কথা বলেন, ফলে এই ভাষায় প্রযুক্তির বিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে জাতীয় এআই নীতি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই খসড়া নীতির অনলাইন গণপরামর্শ ২০২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে কাগজে থাকা এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়া, যাতে দেশ প্রযুক্তির এই নতুন যুগে এগিয়ে থাকতে পারে।





