আরিফ হোসেনVIEW PROFILE →
চ্যাটবট ছাড়িয়ে এজেন্টিক এআইয়ের পথে বাংলাদেশ: ২০২৬ সালে দেশের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্টার্টআপের উত্থান
২০২৬ সালে বাংলাদেশের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাত চ্যাটবটের সীমা ছাড়িয়ে এজেন্টিক এআই, বাংলা ভাষার মডেল, কণ্ঠস্বর প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবায় বাস্তব সমাধান তৈরি করছে। মার্কোপোলো, হিসাব, ইন্টেলসেন্সসহ একাধিক স্টার্টআপ বড় অঙ্কের বিনিয়োগ পেয়ে দেশি ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রসার ঘটাচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাত ২০২৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এক সময় যেখানে আলোচনা মূলত সাধারণ চ্যাটবটের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে এখন দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এমন এজেন্টিক এআই ব্যবস্থা তৈরির দিকে এগোচ্ছে, যা নিজে থেকে পরিকল্পনা করতে, সিদ্ধান্ত নিতে এবং একাধিক সফটওয়্যারে কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম। খুচরা ব্যবসা, ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ থেকে শুরু করে বায়োমেট্রিক্স ও কম্পিউটার ভিশন পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ শুরু হয়েছে।
বিপণন প্রযুক্তিতে অগ্রযাত্রা
এই অগ্রযাত্রার সবচেয়ে আলোচিত নাম মার্কোপোলো এআই। প্রতিষ্ঠানটি ফেসবুক, গুগল ও টিকটকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারণা স্বয়ংক্রিয় করতে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে। প্রতিষ্ঠাতা তাসফিয়া তাসবিন ও রুবাইয়াত ফারহানের হাত ধরে গড়ে ওঠা এই স্টার্টআপ এরই মধ্যে ৫০০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করছে এবং স্টেলারিস ভেঞ্চার পার্টনার্সসহ সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১৫ কোটি টাকারও বেশি সংগ্রহ করেছে।
মার্কোপোলোর সাফল্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা রেসিডেন্সি এইচএফ০ তে জায়গা করে নেওয়া। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা রাখে। রপ্তানিযোগ্য বিপণন প্রযুক্তি এবং প্রমাণিত বাজার চাহিদার সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠানটি দেশের প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভাষা ও কণ্ঠস্বর প্রযুক্তিতে বাংলা

বাংলা ভাষা ও কণ্ঠস্বরভিত্তিক প্রযুক্তিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে হিসাব নামের স্টার্টআপটি। জুবায়ের আহমেদের প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান জিএসএম কলের মাধ্যমে ভয়েস এআই ব্যবহার করে কাঠামোবদ্ধ ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি করে এবং বাংলা ভাষার বৃহৎ ভাষা মডেল উন্নয়নে কাজ করছে। জাপানি ও আঞ্চলিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সিরিজ এ পর্যায়ে ৮০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকহীন দোকানদার, পোশাকশ্রমিক ও কৃষকদের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়েছে।
হিসাব ইতিমধ্যে দ্য সিটি ব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়েছে এবং এফএমসিজি খাতে পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালাচ্ছে। একই ধারায় ইন্টেলসেন্স এআই বাংলা ভাষার প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণ ও স্বয়ংক্রিয় বক্তৃতা শনাক্তকরণ নিয়ে কাজ করছে, যা কোলাহলপূর্ণ টেলিফোন পরিবেশেও কার্যকর। বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের গড়া প্রতিষ্ঠানটি ৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ পেয়েছে এবং ১০টির বেশি ব্যাংকিং কল সেন্টারে সেবা দিচ্ছে।
বাংলা ভাষা প্রযুক্তির আরেকটি নাম সোশিয়ান লিমিটেড, যা তানভীর সৌরভ ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দলের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলা ভাষার প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণ, অনুভূতি বিশ্লেষণ এবং আঞ্চলিক উপভাষা শনাক্তকরণে বিশেষায়িত। স্টার্টআপ বাংলাদেশ ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি দেশীয় ভাষা প্রযুক্তির ভিত্তি আরও মজবুত করছে।
স্বাস্থ্য, কৃষি ও রোবটিক্সে এআই
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ কেবল ব্যবসা বা ভাষায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা স্বাস্থ্যসেবাতেও পৌঁছেছে। নিওস্ক্রিনিক্স নামের স্টার্টআপটি বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহমিদা সুলতানা ও সাদাত ইসলামের হাত ধরে হাতে বহনযোগ্য স্তন ক্যান্সার শনাক্তকরণ যন্ত্র তৈরি করছে। জনস হপকিন্সের একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য প্রতিযোগিতা থেকে ৬০ লাখ টাকা পুরস্কার পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি গাজীপুরের গ্রামীণ এলাকায় পরীক্ষা চালাচ্ছে।
কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা কাজে লাগাচ্ছে এগ্রিকানেক্ট। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের সদস্যদের নিয়ে গঠিত দলটি পোকামাকড়ের পূর্বাভাস, অতি স্থানীয় আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং সরবরাহ শৃঙ্খল উন্নয়নে কাজ করছে। এনভিডিয়া ইনসেপশন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত এই স্টার্টআপ ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ পেয়েছে এবং ২০ হাজারের বেশি কৃষক এর সেবা ব্যবহার করছেন।
রোবটিক্সের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে ডুবোটেক ডিজিটাল। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডুবুরি রোবটিক্স দলের মাহফুজুল হক ও সৌমিক হাসান শ্রান্তর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি বঙ্গোপসাগরে পরিদর্শনের জন্য স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের যান তৈরি করছে। স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড থেকে ৫০ লাখ টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগ পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালে দেশের সেরা স্টার্টআপ পুরস্কারও অর্জন করেছে।
বিনিয়োগ ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে দানা ফিনটেক। গাজী ইয়ার মোহাম্মদের প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির জন্য এআইভিত্তিক বিকল্প ঋণমান নির্ধারণ পদ্ধতি তৈরি করেছে। দক্ষিণ এশিয়া টেক পার্টনার্স ও বাংলাদেশ অ্যাঞ্জেলসের কাছ থেকে ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি ৫টির বেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বড় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে।
এই স্টার্টআপগুলোর সম্মিলিত অগ্রযাত্রা দেশের প্রযুক্তি বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রযুক্তি কেন্দ্রগুলো এই প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিষ্ঠাতাদের বড় অংশই এসেছেন বুয়েট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। এই মেধাবী প্রকৌশলী ও গবেষকদের ধারাবাহিক সরবরাহ দেশীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের ভিত্তি শক্ত করছে। খুচরা, ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ ও শিল্প খাতে ইতিমধ্যে উৎপাদনমুখী এআই ব্যবস্থা চালু হয়েছে, যা অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সাল বাংলাদেশের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চ্যাটবটের সাধারণ প্রয়োগ থেকে বেরিয়ে এসে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন জটিল, বাস্তবমুখী ও রপ্তানিযোগ্য সমাধান তৈরিতে মনোযোগ দিচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ আগামী বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে পারবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।





