আরিফ হোসেনVIEW PROFILE →
৩১ আগস্টের সময়সীমা ঘনিয়ে আসছে: দেশের প্রথম বেসরকারি সাবমেরিন কেব্ল বিপিসিএস আটকে আছে অনুমোদনের জটে
কক্সবাজার থেকে ৪৫ টেরাবিট ক্ষমতার সাবমেরিন কেব্ল বসাতে জাহাজ প্রস্তুত, কিন্তু একাধিক মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র আটকে থাকায় ৩১ আগস্টের বিটিআরসি সময়সীমা হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা। সময়সীমা মিস হলে প্রকল্প পিছিয়ে যেতে পারে পুরো এক বছর।
বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি সাবমেরিন কেব্ল প্রকল্প এখন এক জটিল অচলাবস্থায় আটকে আছে। কক্সবাজার থেকে সমুদ্রের নিচ দিয়ে কেব্ল বসানোর জন্য জাহাজ প্রস্তুত থাকলেও, একাধিক মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না মেলায় ৩১ আগস্ট ২০২৬ সালের সময়সীমা হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রকল্পটির নাম বাংলাদেশ প্রাইভেট কেব্ল সিস্টেম, সংক্ষেপে বিপিসিএস। এটি পরিচালনা করছে তিন প্রতিষ্ঠানের একটি কনসোর্টিয়াম, যেখানে আছে সামিট কমিউনিকেশনস, সিডিনেট কমিউনিকেশনস এবং মেটাকোর সাবকম। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বিটিআরসি থেকে তারা সাবমেরিন কেব্ল স্থাপন ও পরিচালনার লাইসেন্স পায়।
কী এই বিপিসিএস প্রকল্প
বিপিসিএস মূলত একটি ১,৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ শাখা কেব্ল, যা কক্সবাজারকে যুক্ত করবে ক্যাম্পানা গ্রুপের মালিকানাধীন ইউএমও কেব্ল সিস্টেমের সঙ্গে। এই ইউএমও ট্রাঙ্ক লাইনটি মিয়ানমারের থানলিন থেকে সিঙ্গাপুরের তুয়াস পর্যন্ত বিস্তৃত, ফলে বাংলাদেশ যুক্ত হবে আঞ্চলিক ইন্টারনেট মহাসড়কের সঙ্গে।
কারিগরি দিক থেকে কেব্লটি যথেষ্ট শক্তিশালী। এতে থাকছে তিন জোড়া ফাইবার, যার প্রতিটি জোড়া অন্তত ১৫ টেরাবিট প্রতি সেকেন্ড গতি সরবরাহ করতে সক্ষম। অর্থাৎ সব মিলিয়ে কমপক্ষে ৪৫ টেরাবিট প্রতি সেকেন্ড ব্যান্ডউইথ যোগ হবে, যা দেশের ইন্টারনেট সক্ষমতায় বড় ধরনের সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ কোটি মার্কিন ডলার। কনসোর্টিয়াম ইতিমধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছে, যার মধ্যে ক্যাম্পানা গ্রুপকে দেওয়া হয়েছে ৪ কোটি ৩৭ লাখ ডলারের বেশি, মূলত আইআরইউ ফি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ। প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় যুক্ত আছে পাইওনিয়ার কনসাল্টিং।
আটকে আছে যেখানে: ছাড়পত্রের জট
সমস্যার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ছাড়পত্র। কেব্ল বসাতে হলে বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজকে বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকতে হবে, আর সে জন্য প্রয়োজন একাধিক মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্র। ৩১ মার্চ কনসোর্টিয়াম পানামা ও ইন্দোনেশিয়ার পতাকাবাহী জাহাজের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে অনাপত্তি চেয়ে চিঠি দেয়।
কিছু মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে সবুজ সংকেত দিয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র এখনো ঝুলে আছে, ফলে পুরো প্রক্রিয়া থমকে গেছে বলে জানা গেছে।
আন্তঃমন্ত্রণালয় জটিলতাও পরিস্থিতি কঠিন করেছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়টি অন্য দপ্তরে পাঠানোর ক্ষেত্রে বিলম্ব করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। টেলিযোগাযোগ সচিব বিলকিস জাহান রিমি এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত জানিয়েছিলেন যে সংশ্লিষ্ট চিঠি তখনো তাঁদের দপ্তরে পৌঁছায়নি।
হতাশা প্রকাশ করেছেন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারাও। সামিট কমিউনিকেশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরিফ আল ইসলাম বলেন, আমরা ইতিমধ্যে মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ বিনিয়োগ করে ফেলেছি, আর এখন এক জটিল পরিস্থিতিতে আটকে আছি। বিনিয়োগ আটকে থাকায় প্রতিদিনই বাড়ছে আর্থিক ঝুঁকি।
সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়
সময়ই এখন সবচেয়ে বড় শত্রু। বঙ্গোপসাগরে কেব্ল বসানোর উপযোগী সময় কেবল নভেম্বর থেকে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে সমুদ্রে কেব্ল বসানো কার্যত অসম্ভব। ফলে ৩১ আগস্টের সময়সীমা মিস হলে প্রকল্প পুরো এক বছর পিছিয়ে ২০২৭ সালে চলে যেতে পারে।
দেরির আর্থিক খেসারতও কম নয়। বিশেষায়িত আন্তর্জাতিক কেব্ল জাহাজ ও প্রকৌশলী দলকে অলস অবস্থায় ধরে রাখতে কনসোর্টিয়ামকে ক্রমবর্ধমান ডিমারেজ বা বিলম্ব মাশুল গুনতে হচ্ছে। এই ব্যয় বাড়তে থাকলে প্রকল্পের আর্থিক ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ সেবামূল্যের ওপর তা চাপ ফেলতে পারে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের জন্য এই কেব্ল কেন এত জরুরি, তা বোঝা যায় বর্তমান অবকাঠামোর দিকে তাকালে। দেশ এখন মূলত দুটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সাবমেরিন কেব্ল, সিমিউই-৪ ও সিমিউই-৫ এর ওপর নির্ভরশীল। ২০২৪ সালে সিমিউই-৫ এ একটি ত্রুটি দেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বিঘ্নিত করেছিল।
একটি বেসরকারি কেব্ল যুক্ত হলে সেবায় বিকল্প তৈরি হবে, দাম কমতে পারে এবং হঠাৎ বিভ্রাটের ঝুঁকিও কমবে। সামিটের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা কে এম তারিকুজ্জামানের ভাষায়, বাংলাদেশ বিশ্বমানের ইন্টারনেট সক্ষমতা ও সহজলভ্যতা পাওয়ার যোগ্য। এখন সবকিছু নির্ভর করছে সময়মতো ছাড়পত্র মেলার ওপর।





