আরিফ হোসেনVIEW PROFILE →
বাংলাদেশের স্টার্টআপ বিপ্লব: ২০২৬ সালে প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান আর নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত দ্রুত বাড়ছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী দেশে সক্রিয় স্টার্টআপের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে, বিনিয়োগ পৌঁছেছে ৯০ কোটি ডলারে, আর তৈরি হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ কর্মসংস্থান।
বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাত গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। একসময় যেখানে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছিল, এখন সেখানে গড়ে উঠেছে এক প্রাণবন্ত স্টার্টআপ পরিবেশ, যা তরুণ উদ্যোক্তাদের নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
স্টার্টআপের সংখ্যা বাড়ছে দ্রুত
বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী দেশে সক্রিয় স্টার্টআপের সংখ্যা এখন যথেষ্ট বেশি। স্টার্টআপব্লিংকের তথ্যমতে দেশে সক্রিয় স্টার্টআপ ৬৭৭টি, আর লাইটক্যাসল পার্টনার্সের হিসাবে এই সংখ্যা এক হাজার দুইশ ছাড়িয়ে গেছে, যা খাতটির দ্রুত বিস্তারেরই একটি প্রমাণ।
প্রবৃদ্ধির গতিও চোখে পড়ার মতো। প্রতি বছর গড়ে দুইশর বেশি নতুন স্টার্টআপ যুক্ত হচ্ছে এই বাস্তুতন্ত্রে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এক বছরে এই খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যা অঞ্চলটির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
বিনিয়োগ ও লেনদেনের চিত্র
বিনিয়োগের দিক থেকেও অগ্রগতি স্পষ্ট। ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশের স্টার্টআপ খাতে ৯০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ এসেছে। এই অর্থ এসেছে প্রায় ৪০০টি চুক্তির মাধ্যমে, যেখানে যুক্ত ছিল ১৫১টি আলাদা স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান।
তবে বিনিয়োগের ধরন এখনও তুলনামূলকভাবে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বেশিরভাগ লেনদেন সিড ও প্রি-সিড পর্যায়ের, অর্থাৎ একেবারে শুরুর দিকের বিনিয়োগ। এটি ইঙ্গিত দেয় যে খাতটি এখনও বিকাশমান এবং সামনে আরও বড় বিনিয়োগের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ
আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশ ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। স্টার্টআপব্লিংকের বৈশ্বিক তালিকায় দেশটির অবস্থান ৭৭তম, আর দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ রয়েছে চতুর্থ স্থানে। এই অবস্থান দেশের ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তি সম্ভাবনার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।
এই খাতের প্রভাব শুধু সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়, কর্মসংস্থানেও তা স্পষ্ট। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই স্টার্টআপ বাস্তুতন্ত্র প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে বলে ধারণা করা হয়, যা দেশের শ্রমবাজারের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক।
এগিয়ে থাকা খাতগুলো

কোন কোন খাত বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করছে, সেটিও লক্ষণীয়। এর মধ্যে রয়েছে ফিনটেক, ই-কমার্স, লজিস্টিকস, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপ্রযুক্তি, শিক্ষা এবং জলবায়ু সমাধানকেন্দ্রিক উদ্যোগ, যা খাতটির বৈচিত্র্যকেই তুলে ধরে।
এসব খাতের মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে পরিচিত নাম হয়ে উঠেছে। পরিবহন ও লজিস্টিকসে পাঠাও, ই-কমার্স ডেলিভারিতে পেপারফ্লাই এবং ব্যবসায়ীদের সেবায় শপআপ দেশের স্টার্টআপ জগতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে তথ্যে উঠে এসেছে।
বড় বিনিয়োগ ও একীভবন
বড় আকারের বিনিয়োগের উদাহরণও রয়েছে। মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান বিকাশ ২০২১ সালে সফটব্যাংকের কাছ থেকে ২৫ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ পেয়েছিল, যা দেশের প্রযুক্তি খাতে অন্যতম বড় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।
সম্প্রতি খাতটিতে একীভবনের ঘটনাও দেখা গেছে। ২০২৫ সালে শপআপ সৌদি আরবভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সারির সঙ্গে একীভূত হয়ে গঠন করে সিল্ক গ্রুপ। এছাড়া অংকুর বাংলাদেশ ফান্ড ওয়ান নামে ৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের একটি ব্যাংক-সমর্থিত তহবিলও চালু হয়েছে।
সরকারের ভূমিকা
এই বিকাশমান খাতের পেছনে সরকারেরও ভূমিকা রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের অধীনে স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড নামে একটি সরকারি মালিকানাধীন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, যার কার্যালয় ঢাকার আইসিটি টাওয়ারে অবস্থিত।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। বাড়তে থাকা প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগ আর কর্মসংস্থান দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎকে আশাব্যঞ্জক করে তুলেছে, যদিও টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য আরও বড় বিনিয়োগ ও দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন।





