আরিফ হোসেনVIEW PROFILE →
স্টার্টআপে ৪০০ কোটি টাকার বাজি: বাংলাদেশের নতুন 'ফান্ড অব ফান্ডস' কী বদলাতে পারে
স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড চালু করল ৪০০ কোটি টাকার 'ফান্ড অব ফান্ডস'। দেশি-বিদেশি ও উন্নয়ন পুঁজিকে স্টার্টআপ খাতে টেনে আনার এই সরকারি উদ্যোগের লক্ষ্য বড়: ডিজিটাল অর্থনীতিকে জিডিপির ১০ শতাংশে নেওয়া আর বছরে ২ লাখ প্রযুক্তি চাকরি সৃষ্টি।
বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি নতুন এবং আশাব্যঞ্জক অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্টার্টআপ খাতে বড় ধরনের পুঁজি টেনে আনার এক সাহসী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা দেশের উদ্যোক্তা জগতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে এবং হাজারো তরুণের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ খুলে দিতে পারে।
৪০০ কোটি টাকার নতুন তহবিল
এই উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে একটি বড় অঙ্কের তহবিল। স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড গত ১৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে ৪০০ কোটি টাকার একটি 'ফান্ড অব ফান্ডস' চালু করেছে, যা দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে নতুন করে চাঙ্গা করার লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এই বিশেষ ধরনের তহবিলের মূল উদ্দেশ্য হলো একটি সেতুবন্ধন তৈরি করা। এটি দেশি, বিদেশি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে আসা পুঁজিকে একত্রিত করে বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগের ব্যবস্থা করবে, যার ফলে উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসা বড় করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সহজ প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারবেন।

লক্ষ্য যখন আকাশছোঁয়া
এই তহবিল গঠনের পেছনে সরকারের যে বৃহত্তর স্বপ্ন রয়েছে, তা রীতিমতো উচ্চাভিলাষী। সরকার আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে ডিজিটাল অর্থনীতির অবদান বর্তমান মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে একেবারে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
শুধু অর্থনৈতিক অবদান নয়, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও বিশাল। প্রযুক্তি খাতকে দেশের ক্রমবর্ধমান তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের একটি প্রধান উৎসে পরিণত করার অভিপ্রায়ে সরকার প্রতি বছর নতুন করে ২ লাখ প্রযুক্তিনির্ভর চাকরি সৃষ্টির লক্ষ্য স্থির করেছে, যা যুবসমাজের জন্য বিরাট সুখবর।
ভিত্তি যেখানে শক্ত
এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রাগুলো কিন্তু শূন্য থেকে শুরু হচ্ছে না, বরং একটি ইতিমধ্যে গড়ে ওঠা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১ হাজার ২০০-এরও বেশি সক্রিয় স্টার্টআপ রয়েছে এবং ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এই খাতে ৯০ কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ এসেছে, যা যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক।
এই বিনিয়োগের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কোন খাতগুলো সবচেয়ে বেশি এগিয়ে। স্টার্টআপ পুঁজির সবচেয়ে বড় অংশটি টেনেছে ফিনটেক বা আর্থিক প্রযুক্তি খাত, আর এর পরেই রয়েছে ই-কমার্স ও খুচরা ব্যবসা, সফটওয়্যার, লজিস্টিকস এবং যাতায়াত বা মবিলিটির মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলো।
সফলতার গল্প
বাংলাদেশের স্টার্টআপ যে কেবল দেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়, তার প্রমাণ ইতিমধ্যেই মিলছে। এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হলো পাঠাও, যা রাইড শেয়ারিং থেকে শুরু করে খাবার ও কুরিয়ার ডেলিভারি এবং আর্থিক সেবা পর্যন্ত নানা ধরনের সেবা দিয়ে থাকে এবং প্রতিবেশী দেশ নেপালেও তাদের কার্যক্রম সফলভাবে সম্প্রসারিত করেছে।
এই ধরনের সাফল্য নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অনুপ্রেরণার এক বিশাল উৎস হিসেবে কাজ করে। এটি প্রমাণ করে যে সঠিক ধারণা, পর্যাপ্ত পুঁজি এবং দৃঢ় সংকল্প থাকলে বাংলাদেশ থেকেও আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করার মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব, যা পুরো খাতের জন্যই মর্যাদার বিষয়।
এখন প্রয়োজন বাস্তবায়ন
সব মিলিয়ে, নতুন এই 'ফান্ড অব ফান্ডস' এবং সরকারের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যতের জন্য এক আশার আলো জ্বালিয়েছে। তবে এই সুন্দর পরিকল্পনাগুলোকে সফল করতে হলে স্বচ্ছতা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং সঠিক উদ্যোক্তাদের কাছে সময়মতো অর্থ পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কাগজে-কলমে থাকা পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর। যদি সবকিছু ঠিকঠাক এগোয়, তবে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশ কেবল প্রযুক্তির ভোক্তা নয়, বরং উদ্ভাবন ও উদ্যোগের এক নতুন কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে নিজের স্থান করে নিতে পারবে।






