আরিফ হোসেনVIEW PROFILE →
৫ বিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন আর বাস্তবতা: বাংলাদেশের সফটওয়্যার রপ্তানি কেন লক্ষ্যের অনেক পেছনে
গত অর্থবছরে বাংলাদেশের আইসিটি সেবা রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৭২ কোটি ডলারের কিছু বেশি, অথচ লক্ষ্য ছিল ৫ বিলিয়ন ডলার। প্রতিবেশী পাকিস্তান যখন রেকর্ড গড়ছে, তখন কেন পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাত,সেই কঠিন প্রশ্নের গভীরে এই বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাত নিয়ে গত এক দশকে যে বিপুল স্বপ্ন বোনা হয়েছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রতীক ছিল সফটওয়্যার ও আইটি সেবা রপ্তানি থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধানটি বিশাল আকার ধারণ করেছে এবং এই ব্যবধান খাতটির নীতিনির্ধারকদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লক্ষ্য ৫ বিলিয়ন, অর্জন ৭২ কোটি
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সদ্যসমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের আইসিটি সেবা রপ্তানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭২ কোটি ৪৬ লাখ ডলারে। অথচ আইসিটি বিভাগের নির্ধারিত লক্ষ্য ছিল ৫ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৫০০ কোটি ডলার। ফলে অর্জিত রপ্তানি মূল লক্ষ্যের সামান্য একটি অংশ মাত্র, যা খাতটির সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
তবে একেবারে হতাশার চিত্রও নয়। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই রপ্তানি আয়ে প্রায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় খাতটি এখনও এগোচ্ছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধির এই গতি এতটাই ধীর যে, নির্ধারিত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে হলে আরও বহু বছর এবং বহুগুণ দ্রুত অগ্রগতি প্রয়োজন হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

প্রতিবেশীদের সঙ্গে ব্যবধান বাড়ছে
বাংলাদেশের এই ধীরগতি আরও প্রকট হয়ে ওঠে যখন প্রতিবেশী দেশের অর্জনের সঙ্গে তুলনা করা হয়। একই সময়ে প্রতিবেশী পাকিস্তান তাদের আইটি রপ্তানিতে প্রায় ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে রেকর্ড ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, একই অঞ্চলের এক প্রতিযোগী যেখানে বাংলাদেশের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে গেছে।
এই তুলনা কেবল একটি সংখ্যার খেলা নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত সতর্কবার্তা। বৈশ্বিক আউটসোর্সিং বাজারে যখন প্রতিটি দেশ নিজের অবস্থান শক্ত করতে মরিয়া, তখন প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়া মানে ভবিষ্যতের বিপুল সম্ভাবনাময় বাজার হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়া, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ব্যয়বহুল হতে পারে।
রপ্তানির মেরুদণ্ড কম্পিউটার সেবা
বাংলাদেশের এই আইসিটি রপ্তানির অভ্যন্তরীণ কাঠামো বিশ্লেষণ করলে একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক অর্থবছরে মোট আইসিটি রপ্তানির প্রায় ৮৭ শতাংশই এসেছে কম্পিউটার সেবা থেকে, যার মধ্যে রয়েছে সফটওয়্যার উন্নয়ন, আউটসোর্সিং এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নানা সেবা বা আইটিইএস। এটিই এখন খাতটির প্রকৃত মেরুদণ্ড।
বাকি প্রায় ১৩ শতাংশ রপ্তানি এসেছে টেলিযোগাযোগ সেবা খাত থেকে। এই কাঠামো ইঙ্গিত দেয় যে, দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হলো মেধানির্ভর সফটওয়্যার ও সেবা খাত, যা তরুণ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের দক্ষতার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল এবং এখানেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।
বাজার বড়, কিন্তু রপ্তানি ছোট
রপ্তানির ধীরগতি সত্ত্বেও দেশের ভেতরের আইসিটি বাজার কিন্তু বেশ শক্তিশালীভাবেই বেড়ে চলেছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের সামগ্রিক আইসিটি বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলারে, যা এই খাতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও কার্যক্রমের ব্যাপকতাকেই তুলে ধরে।
পূর্বাভাস বলছে, এই বাজার ২০৩০ সাল নাগাদ প্রায় ১২ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যেখানে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার হবে প্রায় ৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ, ঘরোয়া বাজারের এই বিশাল কর্মকাণ্ডকে যদি রপ্তানিমুখী করা যায়, তবে ৫ বিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন খুব একটা অবাস্তব থাকে না বলেই মনে করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।
সম্ভাবনার ভিত্তি সাড়ে সাত লাখ পেশাজীবী
বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর মানবসম্পদ। বর্তমানে দেশে সাড়ে চার হাজারেরও বেশি আইটি ও আইটিইএস প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালাচ্ছে, যেখানে কর্মরত রয়েছেন সাড়ে সাত লক্ষেরও বেশি প্রযুক্তি পেশাজীবী। এই বিপুল কর্মীবাহিনীই খাতটির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার সবচেয়ে মজবুত ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন প্রয়োজন এই দক্ষ জনশক্তিকে উচ্চমূল্যের বৈশ্বিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা, ব্র্যান্ডিং জোরদার করা এবং নীতিগত জটিলতা কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানো। কেবল লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, বরং সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরি করাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে ৫ বিলিয়ন ডলারের গল্পটি বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকল। উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন দেখা জরুরি, তবে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দক্ষতা, অবকাঠামো ও নীতির সমন্বয় অপরিহার্য। আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশ এই ব্যবধান কতটা কমাতে পারে, সেটিই নির্ধারণ করবে তার ডিজিটাল ভবিষ্যতের প্রকৃত গতিপথ।






