আরিফ হোসেনVIEW PROFILE →
নিজের ভাষায় কথা বলা এআই: বাংলা ভাষার জন্য জেনারেটিভ ও ভয়েস মডেল তৈরিতে বাংলাদেশের নতুন যাত্রা
বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাত এখন ফ্রিল্যান্সিং পেরিয়ে নিজস্ব পণ্য তৈরির দিকে এগোচ্ছে, আর তার কেন্দ্রে আছে বাংলা ভাষার জেনারেটিভ ও ভয়েস এআই। সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করছি কেন নিজের ভাষায় কথা বলা এআই আমাদের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ।
আমি সবসময় চেষ্টা করি প্রযুক্তির খবরগুলো সহজ ভাষায় আপনাদের কাছে পৌঁছে দিতে, যাতে শুধু শহরের মানুষ নয়, সাধারণ মানুষও বুঝতে পারেন। এবার এমন একটি পরিবর্তনের গল্প নিয়ে এসেছি যা আমাকে সত্যিই গর্বিত করে, কারণ এটি আমাদের নিজেদের ভাষা, আমাদের প্রিয় বাংলাকে সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগের কেন্দ্রে নিয়ে আসছে।
গত এক দশকে বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাত মূলত পরিচিত ছিল ফ্রিল্যান্সিং আর আউটসোর্সিংয়ের জন্য, যেখানে আমরা বিশ্বের জন্য কাজ করতাম। কিন্তু এখন একটি নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তারা কেবল অন্যের কাজ করে দেওয়ার গণ্ডি পেরিয়ে নিজস্ব পণ্য ও প্রযুক্তি তৈরির দিকে এগোচ্ছেন, আর এই যাত্রার সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশটির নাম বাংলা ভাষার এআই।
ফ্রিল্যান্সিং থেকে নিজের পণ্যের দিকে
এই পরিবর্তনের মাত্রা বোঝাতে কয়েকটি সংখ্যার দিকে তাকানো দরকার, কারণ সেগুলো আমাদের সম্ভাবনার কথা স্পষ্ট করে বলে। বাংলাদেশে এখন সক্রিয় স্টার্টআপের সংখ্যা এক হাজার দুইশর বেশি, আর ২০১০ সাল থেকে এই খাতে বিনিয়োগ এসেছে নব্বই কোটি ডলারেরও বেশি, যা আমাদের বাস্তুতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান শক্তির প্রমাণ।
পাঠাও, শপআপ কিংবা শিখোর মতো নামগুলো এখন আর অপরিচিত নয়, বরং এগুলো লজিস্টিকস, ই-কমার্স ও শিক্ষার মতো ক্ষেত্রে আমাদের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান করছে। এই কোম্পানিগুলো প্রমাণ করেছে যে দেশের ভেতরের সমস্যা বুঝে সমাধান তৈরি করলে তা টেকসই ব্যবসায় পরিণত হতে পারে, আর ঠিক এই আত্মবিশ্বাসই এখন এআই খাতে ছড়িয়ে পড়ছে।
পাশাপাশি আমাদের ফ্রিল্যান্সারদের বিশাল বাহিনীও এই রূপান্তরের বড় ভিত্তি, কারণ তাঁদের হাতে রয়েছে বিশ্বমানের দক্ষতা। ছয় লক্ষ পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি ফ্রিল্যান্সার প্রতি বছর দেশে পাঁচশ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আনছেন, আর এখন তাঁদের অনেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্লকচেইন ও সাইবার নিরাপত্তার মতো উন্নত দক্ষতার দিকে ঝুঁকছেন।
কেন নিজের ভাষার এআই দরকার

এবার আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে, অর্থাৎ বাংলা ভাষার নিজস্ব এআই আমাদের কেন এত দরকার। বিশ্বের বেশিরভাগ বড় এআই মডেল মূলত ইংরেজিসহ কয়েকটি ভাষাকে কেন্দ্র করে তৈরি, ফলে বাংলার সূক্ষ্মতা, আঞ্চলিক টান আর সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট তারা প্রায়ই ঠিকমতো ধরতে পারে না, আর এখানেই আমাদের সুযোগ।
একটি নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি স্টার্টআপ এখন প্রচলিত মেশিন লার্নিং পেরিয়ে জেনারেটিভ এআই, ভয়েস এআই এবং নিজস্ব বাংলা ভাষা মডেল তৈরির দিকে এগোচ্ছে। তারা কেবল বিদেশি প্রযুক্তি অনুবাদ করছে না, বরং একেবারে গোড়া থেকে বাংলার জন্য তৈরি মডেল বানাচ্ছে, যা আমাদের ভাষাকে প্রযুক্তির টেবিলে সমান আসন দিচ্ছে।
এর প্রভাব হতে পারে বিশাল, বিশেষ করে ভয়েস বা কণ্ঠস্বরভিত্তিক এআইয়ের ক্ষেত্রে, যা আমার কাছে সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দিক। আমাদের দেশে বহু মানুষ আছেন যাঁরা হয়তো সাবলীলভাবে লিখতে পারেন না, কিন্তু বলতে পারেন, আর বাংলা ভয়েস এআই তাঁদের হাতে প্রযুক্তির দরজা খুলে দিতে পারে নিছক কথা বলার মাধ্যমে।
ইতিমধ্যেই বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও প্রতিষ্ঠানগুলো খুচরা বিক্রি, ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ, বায়োমেট্রিক্স, কম্পিউটার ভিশন এবং বাংলা স্পিচের মতো বাস্তব ক্ষেত্রে এআই সিস্টেম তৈরি করছে। এর মানে এই প্রযুক্তি আর গবেষণাগারের কল্পনা নয়, বরং তা ধীরে ধীরে আমাদের ব্যাংক, দোকান আর মোবাইল সেবার ভেতরে ঢুকে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে শুরু করেছে।
রাষ্ট্রের স্বপ্ন ও সামনের পথ
এই পুরো যাত্রা সরকারের একটি বড় স্বপ্নের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে, কারণ দেশ ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হতে চায়। সেই লক্ষ্যে সরকার কর ছাড়, স্টার্টআপ সহায়তা, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মতো নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে, যেখানে প্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতকে অন্যতম প্রধান ইঞ্জিন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে আমি সবসময়ের মতো একটি বাস্তব সতর্কবার্তাও দিতে চাই, কারণ শুধু স্বপ্ন আর সম্ভাবনা দিয়ে সব হয় না। মানসম্মত তথ্যভান্ডার তৈরি করা, দক্ষ জনবল ধরে রাখা এবং ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগ নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ, আর এই ভিতগুলো মজবুত না হলে এত সুন্দর সম্ভাবনাও থমকে যেতে পারে।
তারপরও আমি গভীরভাবে আশাবাদী, কারণ নিজের ভাষায় কথা বলা এআই তৈরি করা মানে শুধু ব্যবসা নয়, এটি আমাদের ভাষা ও পরিচয়কে ডিজিটাল ভবিষ্যতে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। আমি এই তরুণ উদ্যোক্তা ও প্রকৌশলীদের যাত্রা নিয়মিত অনুসরণ করব এবং তাঁদের অগ্রগতির গল্প সহজ ভাষায় আপনাদের কাছে পৌঁছে দিতে থাকব, কারণ এটি সত্যিই আমাদের সকলের গল্প।






