আরিফ হোসেনVIEW PROFILE →
ফ্রিল্যান্সিং আর ৫জির হাত ধরে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি: বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম অনলাইন শ্রমশক্তি
বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফ্রিল্যান্সিং শ্রমশক্তি, আর সরকার ৯০ শতাংশ ৫জি কাভারেজের লক্ষ্য নিয়ে ডিজিটাল অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে চাইছে। সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করছি এই খাতের আসল সংখ্যা, সুযোগ আর চ্যালেঞ্জগুলো।
প্রযুক্তি কীভাবে আমাদের প্রতিদিনের জীবন বদলে দিচ্ছে, তার সবচেয়ে জীবন্ত উদাহরণ সম্ভবত ফ্রিল্যান্সিং, কারণ আজ হাজার হাজার তরুণ ঘরে বসেই বিদেশি ক্লায়েন্টের কাজ করছেন, আর তাদের হাত ধরেই বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ডিজিটাল অর্থনীতির মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে উঠছে বলে আমি মনে করি।
পরিসংখ্যান দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়, কারণ বর্তমানে দেশে প্রায় ছয় লাখ পঞ্চাশ হাজার সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন, যারা প্রতি বছর প্রায় পঞ্চাশ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছেন, আর এই সংখ্যা বাংলাদেশকে ভারতের পরেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফ্রিল্যান্সিং শ্রমশক্তির জায়গায় বসিয়েছে।
কেন এই খাত এত গুরুত্বপূর্ণ
শুধু ফ্রিল্যান্সিং নয়, আইটি সংশ্লিষ্ট সেবা রপ্তানি বা আউটসোর্সিং থেকেও আয়ের অঙ্ক এখন প্রায় নব্বই কোটি ডলার ছুঁই ছুঁই করছে, আর অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের হিসেবেও বাংলাদেশ অনলাইন শ্রম সরবরাহে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে, যা আমাদের তরুণদের দক্ষতারই স্বীকৃতি বলে ধরা যায়।
এই কাজগুলো মূলত আপওয়ার্ক আর ফাইভারের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে হয়ে থাকে, যেখানে বাংলাদেশি তরুণরা গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, ওয়ার্ডপ্রেস ডেভেলপমেন্ট আর ভিডিও এডিটিংয়ের মতো সেবা দিয়ে থাকেন, অর্থাৎ বড় কোনো কারখানা ছাড়াই কেবল দক্ষতা আর ইন্টারনেট দিয়েই তারা বিদেশি আয় আনছেন।
সরকারও এই সম্ভাবনা বুঝতে পেরেছে, আর তাই আইসিটি এবং টেলিযোগাযোগ খাতকে অগ্রাধিকারমূলক খাত হিসেবে চিহ্নিত করে জিডিপিতে এর অবদান বর্তমান এক থেকে দুই শতাংশ থেকে আগামী পাঁচ বছরে দশ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা রীতিমতো উচ্চাভিলাষী একটি পরিকল্পনা।
সরকারের ৯০ শতাংশ ৫জি লক্ষ্য

এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত ইন্টারনেট অপরিহার্য, তাই সরকার একটি সমন্বিত টেলিযোগাযোগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যেখানে দেশের নব্বই শতাংশ এলাকায় ৫জি কাভারেজ এবং একশ মেগাবিট পার সেকেন্ড গতির ব্রডব্যান্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে, যাতে কর্মসংস্থান আর ফ্রিল্যান্সিং আরও বাড়ে।
তবে বাস্তবতা হলো এখনো পথ অনেকটাই বাকি, কারণ যদিও ফোরজি কাভারেজ ইতিমধ্যে বেশ বিস্তৃত, ৫জি বাস্তবায়ন এখন কেবল প্রায় পনেরো শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, অর্থাৎ এই বড় ব্যবধান পূরণ করতে হলে সরকারকে আক্রমণাত্মক গতিতে অবকাঠামো সম্প্রসারণ করতে হবে বলে আমি মনে করি।
ডিজিটাল যন্ত্রের দেশীয় উৎপাদনকেও উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, আর তারই অংশ হিসেবে মোবাইল ফোন তৈরিতে ব্যবহৃত বাইশটি কাঁচামালের ওপর অগ্রিম আয়করকে এক শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, যার ফলে দেশেই সাশ্রয়ী দামে ফোন তৈরির সুযোগ তৈরি হবে এবং প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের আরও কাছে পৌঁছাবে।
লক্ষ্য এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি
এসব উদ্যোগের পেছনে একটি বড় স্বপ্ন কাজ করছে, আর তা হলো ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করা, যেখানে ফ্রিল্যান্সিং আর আউটসোর্সিং খাতকে অন্যতম প্রধান ইঞ্জিন হিসেবে ধরা হচ্ছে, আর ২০৩০ সালের মধ্যে আইসিটি খাত থেকে পাঁচশ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যও নেওয়া হয়েছে।
এই লক্ষ্য পূরণে সরকার কর ছাড়, স্টার্টআপ সহায়তা, ডিজিটাল অবকাঠামো প্রকল্প এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মতো নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে, যাতে গ্রামের একজন তরুণও কেবল একটি ল্যাপটপ আর ভালো ইন্টারনেট সংযোগের সাহায্যে বিশ্ববাজারে নিজের জায়গা করে নিতে পারেন।
আমার শেষ কথা হলো, সংখ্যাগুলো যতই আশাব্যঞ্জক হোক, আসল শক্তি হলো আমাদের তরুণদের দক্ষতা আর অধ্যবসায়, আর যদি দ্রুত ইন্টারনেট আর প্রশিক্ষণের সুযোগ ঠিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে ফ্রিল্যান্সিং সত্যিই বাংলাদেশের লাখো পরিবারের জীবন বদলে দেওয়ার একটি টেকসই পথ হয়ে উঠতে পারে।






