আরিফ হোসেনVIEW PROFILE →
মোবাইলেই টাকা: কীভাবে বিকাশ আর নগদ বদলে দিল বাংলাদেশের দৈনন্দিন জীবন
ব্যাংকের লম্বা লাইন এখন অতীত। মোবাইল আর্থিক সেবা কীভাবে ২৩ কোটির বেশি হিসাব আর লাখো কোটি টাকার লেনদেন নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন বদলে দিল, তা সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।
একসময় বাংলাদেশে টাকা পাঠানো মানেই ছিল ব্যাংকের লম্বা লাইন কিংবা কারও হাতে নগদ টাকা তুলে দেওয়ার নানা ঝক্কি ও ঝুঁকি, কিন্তু গত এক দশকে মোবাইল ফোনভিত্তিক আর্থিক সেবা সেই চিরচেনা ছবিটাই একেবারে আমূল বদলে দিয়েছে, সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে গোটা ব্যাংক।
আজ একজন রিকশাচালক থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের গৃহিণী পর্যন্ত প্রায় সবাই মোবাইলে কয়েকটি বোতাম চেপেই মুহূর্তের মধ্যে টাকা পাঠাতে, গ্রহণ করতে কিংবা বিদ্যুৎ ও পানির বিল পরিশোধ করতে পারেন, আর এই নীরব বিপ্লবের একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে বিকাশ ও নগদের মতো জনপ্রিয় সেবাগুলো।
সংখ্যায় এক নীরব বিপ্লব
এই পরিবর্তনের বিশালতা বোঝাতে কয়েকটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ট, কারণ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দেশে মোট মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় তেইশ কোটি নব্বই লাখে, যা আগের বছরের ঠিক একই সময়ের তুলনায় প্রায় দুই কোটি বেশি একটি বিস্ময়কর সংখ্যা।
শুধু হিসাব খোলা নয়, প্রকৃত লেনদেনের পরিমাণও রীতিমতো চোখ ধাঁধানো, কেননা কেবল ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসেই এই মাধ্যমগুলোর মধ্য দিয়ে প্রায় এক লাখ বাহাত্তর হাজার কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে, যা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় বত্রিশ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
এই বিশাল বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য বিকাশের, যারা একাই মোট লেনদেনের আশি শতাংশেরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করে এবং যাদের ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছয় কোটি আটষট্টি লাখ ছাড়িয়ে গেছে, তবে নগদ ও রকেটের মতো সেবাগুলোরও রয়েছে বিশাল ও ক্রমবর্ধমান গ্রাহকভিত্তি।
কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ

এই বড় বড় সংখ্যাগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও গভীর একটি গল্প, আর তা হলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, অর্থাৎ যে কোটি কোটি মানুষ জীবনে কখনো ব্যাংকের দরজা মাড়াননি, তারাও এখন কেবল একটি সাধারণ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক অর্থব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠতে পেরেছেন।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষ, যাদের কাছে নিকটতম ব্যাংক শাখা হয়তো অনেক দূরে অবস্থিত, তাদের জন্য এই সেবা যেন এক আশীর্বাদ হয়ে এসেছে, কারণ শহরে কাজ করা স্বজনের পাঠানো টাকা এখন নিমেষেই পৌঁছে যায় দূরের গ্রামে অপেক্ষায় থাকা পরিবারের হাতে।
এই অসাধারণ অগ্রগতি কেবল বাংলাদেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্ব মঞ্চেও তা রীতিমতো স্বীকৃত, কেননা সারা বিশ্বজুড়ে যত মোবাইল মানি হিসাব রয়েছে, তার প্রায় বারো শতাংশই একা বাংলাদেশের দখলে, যা এই ছোট দেশটির জন্য এক বিরাট বড় অর্জন বলা যায়।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
তবে এই যাত্রা মোটেও এখানেই থেমে নেই, বরং সেবাটিকে আরও সহজ ও নিরবচ্ছিন্ন করে তুলতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মিলে এক নতুন ব্যবস্থা চালু করেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ বা সংক্ষেপে এনপিএসবি।
২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো আন্তঃসংযোগ, অর্থাৎ ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা এবং অন্যান্য পরিষেবা প্রদানকারীকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা, যাতে এক সেবা থেকে অন্য সেবায় টাকা পাঠানো আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মোবাইল আর্থিক সেবা এখন কেবল একটি প্রযুক্তিগত সুবিধা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সচল অর্থনীতি এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নকে নতুন করে গড়ে তোলার এক নীরব অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।






