আরিফ হোসেনVIEW PROFILE →
আমদানি থেকে উৎপাদনে: বাংলাদেশ কীভাবে মোবাইল ফোন তৈরির কেন্দ্র হয়ে উঠছে
ওয়ালটনের হাত ধরে শুরু, স্যামসাংয়ের প্রত্যাবর্তন,দেশে এখন ১৭টি কারখানায় বছরে ১ কোটি ১০ লাখের বেশি স্মার্টফোন সংযোজন হচ্ছে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশের মোবাইল উৎপাদন শিল্পের উত্থান নিয়ে বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাত নিয়ে আলোচনা সাধারণত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট কিংবা ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিংয়ের মতো সেবাভিত্তিক বিষয়ের চারপাশে ঘোরে। তবে এসবের আড়ালে আরও একটি বড় পরিবর্তন ঘটে চলেছে, যা দেশের শিল্প কাঠামোকেই বদলে দিচ্ছে, আর তা হলো দেশের ভেতরেই মোবাইল ফোন তৈরির ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা।
এটি কেবল কারিগরি অগ্রগতির গল্প নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন। এক সময় প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর এই বাজার এখন ধীরে ধীরে স্থানীয় উৎপাদন ও সংযোজনের দিকে ঝুঁকছে, যার ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে এবং দেশেই তৈরি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান ও দক্ষতা।
ওয়ালটনের পথপ্রদর্শক ভূমিকা
এই শিল্পের সূচনার কৃতিত্ব মূলত দেশীয় ইলেকট্রনিক্স জায়ান্ট ওয়ালটনের। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৭ সালে দেশে প্রথমবারের মতো মোবাইল ফোন উৎপাদন শুরু করে এবং সেই অক্টোবরেই দেশের প্রথম মোবাইল ফোন উৎপাদন কারখানা চালু করে, যা পুরো খাতের জন্য পথ খুলে দেয় ও একটি নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয়।
বর্তমানে কেবল ওয়ালটনেরই বছরে ৭০ লাখেরও বেশি ফোন তৈরির সক্ষমতা রয়েছে, যার মধ্যে স্মার্টফোন উৎপাদনের সক্ষমতা ১২ লাখ ইউনিট। এই সংখ্যাগুলো দেশীয় একটি প্রতিষ্ঠানের শিল্প সক্ষমতা কতটা বেড়েছে, তার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
যাত্রা শুরুর পর থেকে অর্জনও উল্লেখযোগ্য। ২০১৭ সালে কারখানা চালুর পর থেকে ওয়ালটন মোট ৬০ লাখ ডিভাইস উৎপাদন করেছে, যার মধ্যে ১৭ লাখ স্মার্টফোন এবং ৪৩ লাখ ফিচার ফোন রয়েছে। এই মিশ্রণ দেখায় যে বাজারে এখনও ফিচার ফোনের চাহিদা যথেষ্ট শক্তিশালী।
স্যামসাংয়ের প্রত্যাবর্তন

দেশীয় ব্র্যান্ডের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জায়ান্টরাও এই বাজারে সক্রিয়। সম্প্রতি স্যামসাং প্রায় ১৮ মাসের বিরতির পর বাংলাদেশে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম আবার শুরু করেছে, এবং দেশে তৈরি স্মার্টফোন আগামী জানুয়ারিতে আবার বাজারে ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই বিরতির পেছনে কিছু নির্দিষ্ট কারণ ছিল। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে স্মার্টফোন উৎপাদন স্থগিত ছিল, মূলত টাকার তীব্র অবমূল্যায়নের কারণে সৃষ্ট কঠিন ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং ফাইভজি ডিভাইস তৈরির জন্য উৎপাদন সুবিধা আধুনিকায়নের প্রয়োজনের কারণে।
তবে প্রত্যাবর্তনের মাত্রাও বড়। স্যামসাংয়ের এই কারখানার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৫ লাখ মোবাইল ফোন। একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের এমন প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে আরও জোরালো করে তোলে।
শিল্পের সামগ্রিক চিত্র
একক প্রতিষ্ঠানের বাইরে গোটা খাতের চিত্রও আশাব্যঞ্জক। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, এই খাতে ১৭টি বড় উৎপাদন কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে আটটি দেশীয় মালিকানাধীন এবং এগুলো মূলত গাজীপুর ও নরসিংদীর মতো শিল্প এলাকায় কেন্দ্রীভূত হয়ে গড়ে উঠেছে।
চাহিদা ও সরবরাহের সমীকরণও এই শিল্পের গুরুত্ব বোঝায়। বাংলাদেশে বছরে ৩ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি হ্যান্ডসেটের চাহিদা রয়েছে, যার মধ্যে ১ কোটি ১০ লাখ স্মার্টফোন দেশেই তৈরি বা সংযোজন করা হচ্ছে, যা আমদানিনির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে একটি বড় অর্জন।
এই অগ্রগতিকে টিকিয়ে রাখতে নীতিগত সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় উৎপাদন জোরদার এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরকার স্মার্টফোন সংযোজনে ব্যবহৃত কাঁচামালের জন্য রেয়াতি আমদানি সুবিধা ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
সামনের পথ
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের মোবাইল উৎপাদন শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু সংযোজন নয়, ধীরে ধীরে গভীরতর উৎপাদন, স্থানীয় যন্ত্রাংশ শিল্প এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের দিকে এগোতে পারলে এটি দেশের শিল্পায়নের একটি টেকসই স্তম্ভে পরিণত হতে পারে।
প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হবে এই গতি ধরে রাখা এবং মুদ্রার ওঠানামা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্যে টিকে থাকা। তবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ এবং নীতিগত সমর্থন মিলিয়ে, বাংলাদেশ এখন নিছক ভোক্তা বাজার থেকে একটি উৎপাদনকেন্দ্রে রূপান্তরের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।






