আরিফ হোসেনVIEW PROFILE →
কিশোরদের জন্য আলাদা চ্যাটজিপিটি আনল ওপেনএআই: বয়স শনাক্তকরণ, অভিভাবক নিয়ন্ত্রণ ও কড়া নিরাপত্তা
১৮ আগস্ট থেকে বিশ্বজুড়ে চালু হওয়া নতুন এই সংস্করণ ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের জন্য। এতে বয়স অনুমানের ব্যবস্থা, অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণের সুযোগ এবং সংবেদনশীল বিষয়ে কঠোর সুরক্ষা যুক্ত করা হয়েছে, যা কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রতিক্রিয়া।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর চ্যাটবট চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই ১৮ আগস্ট থেকে কিশোর ব্যবহারকারীদের জন্য একটি আলাদা সংস্করণ বিশ্বজুড়ে চালু করা শুরু করেছে। ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের কথা মাথায় রেখে তৈরি এই সংস্করণে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অভিভাবকদের জন্য নিয়ন্ত্রণের নানা সুযোগ যুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, নতুন এই ব্যবস্থায় কোনো ব্যবহারকারীকে অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে শনাক্ত করা হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অতিরিক্ত সুরক্ষা কার্যকর হবে। অর্থাৎ কিশোরদের জন্য উপযুক্ত নয় এমন বিষয়বস্তু থেকে চ্যাটজিপিটি তাদের দূরে রাখার চেষ্টা করবে, যেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের সংস্করণের তুলনায় সীমাবদ্ধতা অনেক বেশি থাকবে।
সন্তানের ওপর এআই চ্যাটবটের প্রভাব নিয়ে অভিভাবক, বিদ্যালয় ও নীতিনির্ধারকদের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যেই এই পদক্ষেপ এসেছে। বিশেষ করে কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য, আবেগীয় নির্ভরতা এবং সংবেদনশীল প্রশ্নে চ্যাটবটের দেওয়া উত্তর নিয়ে সম্প্রতি নানা প্রশ্ন উঠেছে, এমনকি আইনি চাপের মুখেও পড়েছে ওপেনএআই।
বয়স যেভাবে শনাক্ত হবে
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি হলো বয়স অনুমানের ব্যবস্থা। ওপেনএআই জানিয়েছে, ব্যবহারকারীর দেওয়া তথ্যের পাশাপাশি অ্যাকাউন্টসংক্রান্ত নানা সংকেত বিশ্লেষণ করে তারা অনুমান করার চেষ্টা করবে যে ব্যবহারকারীর বয়স আঠারো বছরের নিচে কি না। এই অনুমানের ভিত্তিতেই ঠিক হবে কে কিশোর সংস্করণটি ব্যবহার করবে।
বয়স নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে প্রতিষ্ঠানটি নিরাপদ পথটিই বেছে নেবে, অর্থাৎ ব্যবহারকারীকে কিশোরদের উপযোগী সেটিংসের আওতায়ই রাখা হবে। এমনকি আগে কেউ প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে জন্মতারিখ দিয়ে থাকলেও, সন্দেহ তৈরি হলে সেই অ্যাকাউন্টটিকে কিশোর অভিজ্ঞতার আওতায় নিয়ে আসা হতে পারে বলে জানিয়েছে ওপেনএআই।
কোন বিষয়ে বাড়তি সুরক্ষা
কিশোর সংস্করণে বেশ কিছু সংবেদনশীল বিষয়ে কঠোর সীমা আরোপ করা হয়েছে। আত্মক্ষতি ও আত্মহত্যাসংক্রান্ত বিষয়, যৌন বা রোমান্টিক ভূমিকা-অভিনয়, ভয়াবহ সহিংসতা, বিপজ্জনক নানা চ্যালেঞ্জ এবং অতিরিক্ত ডায়েট বা শরীর নিয়ে অস্বাস্থ্যকর আলোচনার মতো বিষয়গুলোতে চ্যাটবটটি এখন অনেক বেশি সাবধানী প্রতিক্রিয়া দেবে।
কেবল বিষয়বস্তু আটকে দেওয়াই নয়, ওপেনএআই চেয়েছে চ্যাটবটের সঙ্গে কিশোরদের আবেগীয় নির্ভরতা কমাতে। তাই চ্যাটজিপিটিকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন এটি নিজেকে অনুভূতিসম্পন্ন কোনো সত্তা হিসেবে উপস্থাপন না করে, এবং ব্যবহারকারীকে ক্ষতিকর কোনো আলোচনার দিকে ঠেলে না দেয়।
অভিভাবকদের হাতে যা থাকবে

অভিভাবকেরা চাইলে নিজেদের অ্যাকাউন্ট সন্তানের চ্যাটজিপিটি অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত করতে পারবেন। এর মাধ্যমে তাঁরা কিছু নির্দিষ্ট সেটিংস নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, যার একটি হলো নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া, যখন চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করা যাবে না, যাকে বলা হচ্ছে কোয়ায়েট আওয়ার্স।
তবে এই নিয়ন্ত্রণের একটি সুস্পষ্ট সীমাও রাখা হয়েছে। অভিভাবকেরা সন্তানের কথোপকথন সরাসরি পড়তে পারবেন না বা তাৎক্ষণিকভাবে নজরদারি করতে পারবেন না। কেবল গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকির আশঙ্কা দেখা দিলে, সীমিত পরিসরে অভিভাবকদের কাছে সতর্কবার্তা পাঠানো হতে পারে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
শুধু নিরাপত্তা নয়, শেখার দিকেও এবার আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন সংস্করণে রয়েছে স্টাডি মোড, যা সরাসরি উত্তর ধরিয়ে না দিয়ে শিক্ষার্থীকে ধাপে ধাপে সমস্যার সমাধানের দিকে নিয়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কুইজ, পড়াশোনার সময় নির্ধারণ এবং হোমওয়ার্ক মনে করিয়ে দেওয়ার মতো নানা সুবিধা।
কেন এই পদক্ষেপ, সামনে কী
এই উদ্যোগ শূন্য থেকে আসেনি। অভিভাবক, শিশু-নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, বিদ্যালয় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ক্রমাগত চাপের মুখে ওপেনএআই এই ব্যবস্থা এনেছে। কিশোরদের ক্ষতিকর উত্তর দেওয়ার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটি আইনি প্রশ্নের মুখেও পড়েছে, আর গোটা এআই শিল্পই এখন তরুণ ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা নিয়ে কড়া নজরদারির মধ্যে রয়েছে।
বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে বিপুলসংখ্যক তরুণ ও শিক্ষার্থী দ্রুত এআই চ্যাটবট ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, এই পরিবর্তন বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বিশ্বজুড়ে চালু হওয়া এই সুরক্ষাব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে বয়স অনুমানের নির্ভুলতা এবং বাস্তব ব্যবহারের অভিজ্ঞতার ওপর।





